

ভালো কাজের স্বীকৃতি বা প্রশংসা শুনে আত্মতুষ্ট না হয়ে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। অতিরিক্ত প্রশংসা মানুষের মধ্যে অহংকার ও আত্মতুষ্টি সৃষ্টি করে, যা আমল বরবাদ করে দেওয়ার অন্যতম কারণ। রসুলুল্লাহ (সা.) অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অতিরিক্ত প্রশংসাকে ‘মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার’ সমতুল্য বলেছেন। প্রশংসা শোনার পর বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে নিজের ভুলত্রুটি মাফ চেয়ে মহান আল্লাহর রহমত কামনা করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
মানুষের ভালো কাজের স্বীকৃতি কিংবা প্রশংসা পেলে ভালো লাগাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এক মানবিক অনুভূতি। কেউ কারো জ্ঞান, যোগ্যতা, আমল বা চরিত্রের প্রশংসা করলে মনে এক ধরনের আনন্দ তৈরি হয়। তবে এ প্রশংসা অনেক সময় মানুষের অজান্তেই আত্মতুষ্টি ও অহংকারের বীজ বুনে দেয়। প্রশংসা যদি মানুষকে আরও ভালো কাজের প্রেরণা জোগায়, তবে তা ইতিবাচক। কিন্তু সেই প্রশংসার কারণে কেউ যদি নিজের দুর্বলতা ভুলে যায়, আমলে অহংকার চলে আসে কিংবা নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করে, তবে তা আত্মিক ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন:
“অতএব, তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। কে তাকওয়াবান, সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক অবগত।” (সূরা : আন-নাজম, আয়াত : ৩২)
মানুষ কেবল তার বাহ্যিক আমল বা ভালো কাজ দেখতে পারে, কিন্তু তার অন্তরের প্রকৃত অবস্থা ও নিয়তের বিশুদ্ধতা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। কোনো আমল আল্লাহর দরবারে আদৌ কবুল হয়েছে কি না, তা কারো জানা নেই। তাই মানুষের প্রশংসায় প্রলুব্ধ হয়ে নিজেকে নিশ্চিতভাবে নেককার ভাবা সমীচীন নয়।
অতিরিক্ত প্রশংসা সম্পর্কিত সতর্কবার্তা:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতিরিক্ত প্রশংসা করা ও শোনার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। একবার এক ব্যক্তি হজরত উসমান (রা.)-এর অতিরিক্ত প্রশংসা করলে হজরত মিকদাদ (রা.) তার দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। কারণ হিসেবে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ উল্লেখ করে বলেন:
“তোমরা যখন অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০০২)
অন্য এক ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে অন্য কারো মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করতে শুনে বলেন:
“তোমরা তো লোকটির মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬০)
অর্থাৎ, অতিরিক্ত প্রশংসার মাধ্যমে লোকটিকে আত্মতুষ্টি ও বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো।
প্রশংসা শুনলে মুমিনের করণীয়:
কেউ প্রশংসা করলে নিজের কৃতিত্ব মনে না করে স্মরণ রাখা উচিত যে—আমাদের মধ্যকার সব ভালো গুণ, জ্ঞান, সামর্থ্য ও ভালো কাজের তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমাদের কাছে যে নেয়ামত রয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই।” (সূরা : আন-নাহল, আয়াত : ৫৩)
প্রশংসার মুখে আত্মতুষ্টি থেকে বাঁচার মোক্ষম উপায় হলো নিজের গোপন ত্রুটি ও দুর্বলতার কথা মনে করা। মানুষ কেবল আমাদের বাহ্যিক রূপ দেখে, আর আল্লাহ তাআলা আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন।
হজরত আবু বকর (রা.) কারো কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শুনলে এই বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন:
اللَّهُمَّلَاتُؤَاخِذْنِيبِمَايَقُولُونَ،وَاغْفِرْلِيمَالَايَعْلَمُونَ،وَاجْعَلْنِيخَيْرًامِمَّايَظُنُّونَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লা তুআখিযনি বিমা ইয়াকুলুনা, ওয়াগফিরলি মা লা ইয়া’লামুনা, ওয়াজ’আলনি খাইরাম মিম্মা ইয়াযুন্নুন।
অর্থ: “হে আল্লাহ! তারা আমার সম্পর্কে যা বলে, সে কারণে আমাকে পাকড়াও করবেন না; তারা আমার যে বিষয়গুলো জানে না, সেগুলো ক্ষমা করুন এবং তারা আমাকে যেমন মনে করে, তার চেয়ে আমাকে উত্তম করে দিন।”
অতএব, মানুষের প্রশংসায় প্রফু্ল্ল ও অহংকারী না হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা এবং নিজের সংশোধনে আত্মনিয়োগ করাই একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়।
মূল শিক্ষণীয়: প্রশংসা এলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং নিজের অহংকার দমন করা।
প্রশংসা শোনার দোয়া: “আল্লাহুম্মা লা তুআখিযনি বিমা ইয়াকুলুনা…” দোয়ার মাধ্যমে নিজের ভুলত্রুটির ক্ষমা প্রার্থনা করা।
সতর্কতা: অতিরিক্ত প্রশংসা থেকে দূরে থাকা ও অপরের অতিরিক্ত প্রশংসা না করা।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।