
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের আবেগ, সাহস এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের এক মহাকাব্য। এই আন্দোলনে তরুণদের আবেগ ছিল বহুমাত্রিক—সেখানে যেমন ছিল বুক ফাটানো আর্তনাদ, তেমনি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন সংকল্প।
আন্দোলনের শুরুতে যখন শিক্ষার্থীদের অবমাননা করা হয়েছিল, তখন সেই অপমান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রতিরোধের তীব্র জেদ। “তুমি কে? আমি কে? বিকল্প নয়, অধিকার”—এমন স্লোগানগুলো শুধু শব্দ ছিল না, বরং তরুণদের আত্মমর্যাদার বহিঃপ্রকাশ ছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাদের পিছু না হটার মূল শক্তি ছিল এই জেদ।
আবু সাঈদ, মুগ্ধ বা নাম না জানা শত শত শহীদের রক্ত দেখে তরুণদের মনে গভীর শোক দানা বেঁধেছিল। কিন্তু এই শোক স্তব্ধতায় পর্যবসিত না হয়ে রূপ নিয়েছিল প্রচারাভিভূত ক্রোধে। বন্ধুদের রক্তমাখা শার্ট বা রাস্তায় পড়ে থাকা জুতো দেখে তারা বুঝতে পেরেছিল, “হয় বিজয়, নয় শাহাদাত”।
এই আন্দোলনে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে ‘আমরা’ বোধটি প্রবল হয়ে উঠেছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইবোনদের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছিল, কিংবা রাস্তার পাশের হকাররা যখন তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের পানি দিয়েছিল—তখন এক অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়েছিল। তরুণদের মনে এই বোধ গেঁথে গিয়েছিল যে, তারা একা নয়।
দশকব্যাপী ভয়ের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, জুলাইয়ের রাজপথে তরুণরা তা ভেঙে চুরমার করে দেয়। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, যখন জীবনের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়ায়, তখন মৃত্যুভয় তুচ্ছ হয়ে যায়।
হাসিনা সরকারের পতনের পর তরুণদের আবেগে যুক্ত হয়েছে বিশাল এক প্রত্যাশা। তারা শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, বরং রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল সংস্কার চেয়েছিল। গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে তারা যে সৌন্দর্যবোধ ও স্বপ্নের কথা বলেছে, তা ছিল এক বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা।
জুলাইয়ের তপ্ত দিনগুলো তরুণদের শিখিয়েছে যে, ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো স্বৈরাচারই অপরাজেয় নয়। এই আবেগই আগামী দিনের বাংলাদেশকে পথ দেখাবে।
লেখা:
সাকিব জাহান (মিশু)
তরুণ সাংবাদিক, লেখক ও
শিক্ষার্থী, ওয়ার্ল্ড ইউনির্ভাসিটি অফ বাংলাদেশ।