

আন্তর্জাতিক ডেক্স
ঢাকা: আসন্ন শীত মৌসুমের আগেই দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় ধরনের এক দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে এলো কাতার। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে চরম বিঘ্ন ঘটায় আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্থগিত ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’।
একই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য ‘ফোর্স মেজিউর’ (অনিবার্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত) নোটিশের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, এ বছরের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ে। তখন থেকেই কাতারএনার্জি প্রথমবারের মতো এলএনজি সরবরাহ বন্ধের ‘ফোর্স মেজিউর’ নোটিশ জারি করে। কয়েক দফায় মেয়াদের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে এবার তা নভেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলো।
সাময়িক এই অচলাবস্থার কারণে শুধু বাংলাদেশই নয়, পাকিস্তান, ভারত এবং ইতালির মতো শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলোও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গ্যাস সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কাতার যেখানে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো বিভিন্ন দেশে পাঠাতে পেরেছিল, চলতি বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৮টিতে। এর ফলে কাতারের মোট এলএনজি রপ্তানি এক ধাক্কায় প্রায় ৯৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। রাস লাফানের প্রধান উৎপাদন অবকাঠামোর সক্ষমতা কমা এবং হরমুজের ঝুঁকি থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প-কারখানা সচল রাখার প্রধান নিয়ামক হলো প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি। কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি পাওয়ার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের স্বস্তি ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হলো।
১. স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ মূল্য: দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গ্যাস না পেলে বাংলাদেশকে খোলাবাজার বা ‘স্পট মার্কেট’ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চড়া দামে এলএনজি ক্রয় করতে হবে।
২. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ: আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্যে এলএনজি কিনতে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে।
৩. উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি: গ্যাস সরবরাহে টান পড়লে একদিকে যেমন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হবে, অন্যদিকে সরকারের পরিচালনা ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
উত্তর গোলার্ধে শীত আসন্ন হওয়ায় খুব শিগগিরই ইউরোপের দেশগুলোতে ঘর গরম রাখা এবং গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে জার্মানিসহ তাদের গ্যাস মজুত বাড়াতে বিকল্প উৎসের পেছনে ছুটছে। কাতার থেকে এশিয়ার দেশগুলোতে গ্যাস না আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের সীমিত সরবরাহের সুযোগে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা বিশ্ববাজারে এলএনজির দামকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারের ধনী ও ক্ষমতাবান দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে উচ্চমূল্যেও পর্যাপ্ত এলএনজি পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সরকার যদি দ্রত বিকল্প উৎস বা অন্য কোনো দেশের সাথে বিশেষ চুক্তির ব্যবস্থা না করতে পারে, তবে শীতের শুরুতেই বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
(কপিরাইট: somoyerkatha.com)
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।